পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য গঠনের ইতিহাস

 ১৯৪৭ সালে দেশবাসীর স্বাধীনতার স্বাদকে বহুগুন তিক্ত করে দিয়েছিলো একসঙ্গে পাশাপাশি থাকতে না পারার যন্ত্রণা। ধর্মীয় ঘৃনা, বিদ্বেষ এবং নারকীয় হিংসা শুধু একশ্রেনীর নয়, সব শ্রেনীর মানুষের শিরদাঁড়াতে যে ঠান্ডা নিরাপত্তাহীনতার চোরা স্রোত বইয়ে দিয়েছিলো তাতে ভারতীয় উপমহাদেশের দুই বৃহত্তম সম্প্রদায় হিন্দু এবং মুসলমান কেউই আর নিজেদের সুরক্ষিত ভাবতে পারেন নি। পরিচিত মুখগুলো কেমন যেন অপরিচিত আর ফ্যাকাশে হয়ে গিয়েছিলো। স্বাধীনতার প্রাক্কালে কয়েক কোটি মানুষের মনকে সাম্প্রদায়িকতার বিষে যে মানুষটি জর্জরিত করে তুলেছিলেন, তিনি আর কেউ নয়, মহম্মদ আলি জিন্নাহ। 

পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য গঠনের ইতিহাস
পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য গঠনের ইতিহাস 


স্বাধীনতা লাভের প্রায় এক দশক আগে থেকেই জিন্নার নেতৃত্বাধীন মুসলিম লিগ সাম্প্রদায়িকতার তাস খেলে দেশের মুসলিমদের একটা বড়ো অংশকে ক্রমাগত হিন্দুদের বিরুদ্ধে খেপিয়ে চলেছিলো। ব্রিটিশ সরকার বা কংগ্রেস কেউই এই খ্যাপামী বন্ধ করার বিন্দুমাত্র চেষ্টা করেনি। ব্রিটিশ সরকার উস্কানি দিয়ে এবং কংগ্রেস সমঝোতা করে পরিস্থিতিকে মোকাবিলা করার চেষ্টা করেছিলো।

কিন্তু দেখা গেলো তাদের সব প্রচেষ্টা ততদিনে পুরোটাই অকেজো হয়ে গেছে। কারন মুসলমানদের পৃথক হোমল্যান্ড "পাকিস্তানের" তাসটি তখন আর জিন্নার হাতে ছিলো না। ওটা তখন ক্ষুদ্র পরিসর থেকে নেমে এসেছিলো বৃহত্তর পরিসরে - খোলা উন্মুক্ত মুসলমান জনতার হাতে। এদিকে জনতার হাতকে লাগাম পরানোর সব ক্ষমতা তখন জিন্নারও চলেগিয়েছিলো। অন্যদিকে জিন্নার খ্যাপামীকে লাগাম পড়ানোর উপযুক্ত একটা লোকও তখন কংগ্রেসে ছিলো না। 

জিন্নাকে কংগ্রেসে একমাত্র লাগাম পড়ানোর উপযুক্ত লোক ছিলেন সুভাষ চন্দ্র বসু। কিন্তু ১৯৩৯ খ্রিঃ অত্যন্ত কদর্যভাবে তাকে কংগ্রেস থেকে বের করে দেওয়া হয়েছিলো। এর ফলে দুটো সুবিধা হয়েছিলো, এক, জওহরলাল নেহেরুর পথের কাঁটাটি যেমন সরে গিয়েছিলো, তেমনই জিন্নার খোলা মাঠে খেলতেও সুবিধা হয়েছিলো।

আজকের আমাদের লেখার মুখ্য চরিত্র অবশ্য জিন্না বা সুভাষ নন। তিনি অন্য এক ধারার মানুষ, যিনি এবং যার ভূমিকা স্বাধীনতার এতগুলি বছর পরও ইতিহাসে দুর্ভাগ্যক্রমে অনালোচিত। ইনি হলেন  শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়। সুভাষ চন্দ্র বসুর পর তিনিই দ্বিতীয় ব্যক্তি যিনি, মুসলিম লীগকে শুধু সফল ভাবে লাগাম পড়াতে পেরেছিলেন এমন নয়, ধর্মের ভিত্তিতে ভারত ভাগ করা লিগকে, ধর্মের ভিত্তিতে পূর্বপাকিস্তান ভাগ করতে বাধ্য করেছিলেন। তাঁর প্রচেষ্টা ও দূরদর্শিতার ফলেই ১৯৪৭ সালে একসঙ্গে স্বাধীনতা, পাকিস্তান লাভের পাশাপাশি "পশ্চিমবঙ্গ" রাজ্যও সৃষ্টি হয়।

(ক.) পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য গঠনের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট :-

ইতিহাসের গর্ভ থেকেই বর্তমান জন্ম নেয়। পশ্চিমবঙ্গও এর ব্যতিক্রম নয়। ১৯০৫ খ্রিঃ বাঙালি হিন্দুদের কোনঠাসা করার জন্য লর্ড কার্জন যখন বঙ্গভঙ্গ করেন, তখন সরকার ও একশ্রেনীর মুসলিম নেতারা পূর্বপাকিস্তানের বিভিন্ন জায়গায় জনসমাবেশ করে বুঝিয়ে দেন বাঙালি হিন্দুদের থেকে দূরে থাকলে বাংলার মুসলমান সমাজ কিভাবে এবং কোন কোন দিকে কতখানি সুবিধা পেতে পারেন। দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে ভাঙ্গনের প্রথম চিড়টা তখনই ধরেছিলো। পরবর্তীকালে কংগ্রেসের নেতারা জাতীয়তাবাদের প্রলেপ দিয়ে চিড়টা মেরামত করার আপ্রাণ চেষ্টা করলেও, ভাঙ্গনের চোরা দাগটা কিন্তু থেকেই যায়।

বাংলা সহ ভারতের রাজনীতিতে ভাঙ্গনের একটা চোরা স্রোত তখন থেকেই চোরাপথে বইতে শুরু করে। বঙ্গভঙ্গের ঠিক পরের বছরেই মুসলমানদের স্বার্থ রক্ষার জন্য ১৯০৬ খ্রিঃ গড়ে তোলা হয় মুসলিম লিগ। ব্রিটিশ সরকার ১৯০৯ খ্রিঃ মর্লে মিন্টো আইন, ১৯১৯ খ্রিঃ মন্টেগু চেমসফোর্ড আইন প্রনয়ন করে মুসলিমদের পৃথক নির্বাচনমন্ডলীর ব্যবস্থা করে ঠারেঠোরে বুঝিয়ে দিতে চেয়েছিলো, মুসলমানরা ভারতীয় সমাজ থেকে আলাদাই। আলিগড়ের রাজনৈতিক ভাবাদর্শ শিবির ও গোঁড়া হিন্দু বিরোধী মৌলবীরাও এটাই মনে করতেন। এই মিল কোথাও যেন তিন সম্প্রদায়ের অতৃপ্ত কামনা বাসনাকে এক জায়গায় এনে সমবেত করেছিলো। এদের সম্মিলিত প্রচেষ্টা ছিলো ভারতীয় অমুসলিমদের "হিন্দু" হিসাবে দেখা এবং তাদের একঘরে করে রাখা।

তাদের এই প্রচেষ্টার প্রতিক্রিয়া স্বরুপ ভারতের বিভিন্ন প্রদেশে হিন্দু স্বার্থ রক্ষার জন্য প্রতিষ্ঠিত হয় বিভিন্ন আঞ্চলিক হিন্দুসভা। যার মধ্যে অন্যতম ছিলো ১৯০৯ খ্রিঃ প্রতিষ্ঠিত পাঞ্জাব হিন্দু সভা১৯১৫ খ্রিঃ এপ্রিল মাসে হরিদ্বারের কুম্ভমেলায় পন্ডিত মদনমোহন মালব্যের উদ্যোগে সবকটি আঞ্চলিক হিন্দুসভাকে এক করে গঠন করা হয় "সর্বভারতীয় হিন্দু সভা"। ১৯২১ খ্রিঃ এর নাম বদলে রাখা হলো "অখিল ভারতীয় হিন্দু মহাসভা"। 

আসলে গান্ধীর আগমনের আগেই ভারতীয় রাজনীতি ও সমাজে বিভাজনের চোরা স্রোতধারা যেভাবে সাংগঠনিক রুপ নিতে শুরু করেছিলো, গান্ধী নেতৃত্বাধীন কংগ্রেস তাকে "ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয়তাদের" চাদর পড়িয়ে আড়াল করতে চেয়েছিলো। কিন্তু শতচ্ছিন্ন, ফুটিফাটা মলিন চাদরের ফাঁকে মাঝে মধ্যেই তা কদর্যভাবে বেরিয়ে পড়তো। কংগ্রেস জাতীয়তাদের চাদরে তাকে পুনরায় ঢাকাঢুকি দেওয়ার চেষ্টা করতো। মুসলিম বিচ্ছিন্নতাবাদী ধারাকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে পুনরায় জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে সামিল করাতো। শেষমেষ এসব করতে করতে বেচারা কংগ্রেস নেতারাও হাঁপিয়ে উঠেছিলেন আর এই সুযোগটাকেই কাজে লাগিয়ে কাজ হাসিল করে নিতে পেরেছিলেন জিন্না। 

জিন্নার সাম্প্রদায়িক আন্দোলন শেষমেষ কংগ্রেসের "ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয়তাবাদের" চাদরটাকে শুধু ফুঁটো করে দেয় নি, ওটাকে ছিঁড়ে ফালাফাল করে তার অন্তরালে থাকা মুসলমানদের টেনে বের করে পাকিস্তানে নিয়ে যায়। মদ ও শুয়োরের মাংসপ্রেমী জিন্না শুধু মুসলমানদের টেনে নিয়ে গেলে সমস্যা ছিলো না। সমস্যা ছিলো ভারতের ভূগোল, সেই ভৌগলিক পরিমন্ডলে পাশাপাশি বসবাসরত হিন্দু মুসলমান সম্পর্ক, ভারতীয় ভূগোলের প্রতি জিন্না ও লিগের লোভ। এসবই চল্লিশের দশকে ভারতীয় সমাজ ও রাজনীতিকে করে তুলেছিলো জটিল ও উত্তপ্ত।

(১.) ১৯৩৭ খ্রিঃ প্রাদেশিক নির্বাচন ও বাংলা :-

১৯৩৪ খ্রিঃ আইন অমান্য গন আন্দোলন প্রত্যাহারের পর ব্রিটিশ সরকার ভারতীয়দের ক্ষোভ প্রশমনের জন্য ১৯৩৫ খ্রিঃ ভারত শাসন আইন প্রনয়ন করে। এই আইনে ভারতীয়দের হাতে "প্রাদেশিক স্বায়ত্ত্বশাসনের" নামে কিছুটা স্বাধীনতার স্বাদ দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। ঠিক হয় কেন্দ্রীয় শাসনের ভারটা ব্রিটিশ বাহাদূরের হাতেই থাকছে, আর প্রদেশ গুলোর শাসনের ভার ভারতীয় নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের হাতেই ছেড়ে দেওয়া হবে। দুধের স্বাদ ঘোলে মেটানোর মতো বিষয়টা হয়ে দাঁড়ালেও, সবদলই এটা মেনে নিয়েছিলো। মেনে নেওয়া ছাড়া আর বিকল্প উপায়ও কিছু ছিলো না।

১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইন অনুযায়ী প্রাদেশিক আইনসভা নির্বাচনের ব্যবস্থা করা হলো ১৯৩৭ খ্রিঃ। ১৯৩৫ খ্রিঃ আইনেই বলা হয়েছিলো প্রদেশ গুলোকে স্বায়ত্ত্বশাসন দেওয়া হচ্ছে । সেই সময় ব্রিটিশ ভারতের প্রদেশের সংখ্যা ছিলো ১১ টি। যথা - মাদ্রাজ, বাংলা, বিহার, ঊড়িষ্যা, যুক্তপ্রদেশ (উত্তর প্রদেশ) মধ্যপ্রদেশ, বোম্বাই, আসাম, উত্তর পশ্চিম প্রদেশ, পাঞ্জাব ও সিন্ধু। 

ভারত শাসন আইন অনুযায়ী বাংলাতে "আইন পরিষদ" ও "বিধানসভা" নামে একটি দ্বিকক্ষবিশিষ্ট আইনসভার গঠন করা হয়। ১৯৩৭ খ্রিঃ যে প্রাদেশিক নির্বাচন হলো, তার ফল হলো বেশ চমকপ্রদ ও বাংলার পক্ষে দিগনির্নয়কারী

ভারতের ১১ টি প্রদেশের মধ্যে কংগ্রেস মাদ্রাজ, বিহার, ঊড়িষ্যা, যুক্তপ্রদেশ ও মধ্য প্রদেশ - এই ৫ টি রাজ্যে সংখ্যা গরিষ্ঠতা লাভ করে। ভারতের ৪ টি প্রদেশ বোম্বে, আসাম, বাংলা ও উত্তর পশ্চিম প্রদেশে বৃহত্তম দল হিসাবে উঠে আসে। বাদবাকি দুটি প্রদেশে পাঞ্জাব ও সিন্ধু তে মিশ্র অবস্থানে থাকে।

মজার ব্যাপার হলো, ১৯৩৭ খ্রিঃ বাংলার সাধারণ নির্বাচনে কোন দলই একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায় নি। এই নির্বাচনে বাংলায় কংগ্রেস ৫৪ টি আসন পেয়ে বৃহত্তম দল হলেও, সরকার গঠনের ম্যাজিক ফিগার ছুঁতে পারে নি। মুসলিম লিগ পেয়েছিলো ৪০ টা আসন। ফজলুল হকের "কৃষক প্রজাপার্টি" পেয়েছিলো ৩৬ টি আসন। অন্যদিকে স্বতন্ত্র বা নির্দল মুসলিম ও হিন্দু পেয়েছিলো যথাক্রমে ৪২ টি ও ৩৭ টি আসন। 

বলা বাহুল্য, ১৯৩০-এর দশকের বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দার প্রভাবে বাংলার পাট চাষী ও সাধারণ কৃষকদের অবস্থা এমনিতেই চরম সঙ্গীন ছিলো । এর ওপর ছিলো হিন্দু জমিদার ও মহাজনদের তীব্র শোষণ। এসবের ফলে গ্রাম বাংলার মুসলিম ও নিম্নবর্ণের হিন্দু কৃষকদের একটা বড়ো অংশের মনে প্রবল রাগ জমেছিলো। এমতাবস্থায় শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হকের  "কৃষক প্রজা পার্টি" বাংলার গ্রামীণ মেহনতি মানুষের প্রধান মুখ ও ক্ষোভের হাতিয়ার হয়ে ওঠে। হকের  "লাঙ্গল যার, জমি তার" এবং "বিনা ক্ষতিপূরণে জমিদারি প্রথা উচ্ছেদ"-এর স্লোগান বাংলার রাজনীতিতে বিশাল ঝড় তোলে। কৃষক প্রজা পার্টি ১৯৩৭ এর নির্বাচনে এরই ফায়দা তোলে। 

যাইহোক, ​১৯৩৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে যখন ভোটের ফল  ঘোষনা করা হলো, তখন দেখা গেলো, বাংলায় কোনো দলই  নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা (১২৫টি আসন) পেলো না। এর ফলে বাংলার আইনসভা হয়ে দাঁড়ালো একটি "ত্রিশঙ্কু আইনসভা" (Hung Assembly), যেখানে কোন দলের কাছেই সরকার গড়ার মতো পর্যাপ্ত বিধায়ক নেই।

এমতাবস্থায়, বাংলায় সরকার গঠন নিয়ে এক নাটকীয় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। প্রগতিশীল কর্মসূচির ভিত্তিতে শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হক প্রথমে কংগ্রেসের সাথে কোয়ালিশন বা জোট সরকার গঠনের প্রস্তাব দেন। কিন্তু কংগ্রেস বৃহত্তম দল হয়েও এই প্রস্তাবে রাজি হয় নি। বহু জমিদার তখন শুধু যে কংগ্রেস করতেন এমন নয়, তারা এই দলে প্রচুর অর্থও পার্টি ফান্ডে দিতেন। কংগ্রেসের স্থানীয় নেতৃত্বের একটা বড় অংশও ছিলো জমিদার। সুতরাং খুব স্বাভাবিক ভাবেই জমিদার বিরোধী একটি দলের সঙ্গে(কৃষক প্রজা পার্টি) কংগ্রেসের সরকার গঠন করতে নানা নীতিগত আপত্তি ছিলো। 

এছাড়া, এইসময় কংগ্রেস হাইকম্যান্ড ব্রিটিশ সরকারের ওপর চাপ দেওয়ার উদ্দেশ্যে নির্বাচনে বৃহত্তম দল হয়েও বাংলায় প্রাদেশিক সরকার গঠনে যেতে চায় নি। কংগ্রেস সরকার গঠন অপেক্ষা বাংলার রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তির বিষয়টিকে অধিক গুরুত্ব দেওয়ায় ফজলুল হকের সাথে সরকার গঠনে সরাসরি অসম্মতি জানায়। 

এর ফলে ফজলুল হক বাধ্য হয়ে মুসলিম লীগের সাথে হাত মিলিয়ে সরকার গঠন করেন। ১৯৩৭ সালের ১ এপ্রিল এ. কে. ফজলুল হক অখন্ড বাংলার প্রথম প্রধানমন্ত্রী (Premier)(তখন প্রাদেশিক সরকারের প্রধানকে মুখ্যমন্ত্রীর বদলে প্রধানমন্ত্রী বলেই ডাকা হতো) হিসেবে মুসলিম লীগ ও কৃষক প্রজা পার্টির কোয়ালিশন সরকার গঠন করেন। 

এখানে বলে রাখা ভালো, নির্বাচনে বৃহত্তম দল হয়েও কংগ্রেসের সরকারে না যাওয়াটা একটা বিরাট ঐতিহাসিক ভুল ছিলো। কারন এর ফলে বাংলার রাজনীতির প্রচলিত সমীকরনটাই বদলে যায়। বাংলায় সরকারে যোগ দেওয়ার ফলে মৃতপ্রায় মুসলিম লীগ নতুন জীবন পায়। ফজলুল হকের মতো গণনেতার জনপ্রিয়তাকে ব্যবহার করে তারা বাংলার প্রত্যন্ত অঞ্চলের সাধারণ মুসলিম কৃষকদের কাছে নিজেদের ভিত শক্ত করে নেয়। এর মাশুল শুধু কংগ্রেসকে নয়, সারা বাংলার আপামোর হিন্দুদের দিতে হয়। 

(২.) বাংলার রাজনীতিতে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের আগমন :-

১৯৩৭ খ্রিঃ নির্বাচনে অংশগ্রহণের মধ্য দিয়েই বাংলার রাজনীতিতে অভিষেক ঘটে আরেক নব্য জননেতা শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের। শ্যামাপ্রসাদ ছিলেন "বাংলার বাঘ" নামে খ্যাত আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের সুযোগ্য পুত্র ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বকনিষ্ঠ উপাচার্য, যিনি ১৯৩৪ থেকে ১৯৩৮ খ্রিঃ পর্যন্ত তাঁর কার্যকাল সম্পন্ন করেন। ১৯৩৭ খ্রিঃ নির্বাচনে শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই স্বতন্ত্র বা নির্দল প্রার্থী হিসাবে আইন সভায় নির্বাচিত হন। 

(৩.) শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি কেন তৎকালীন রাজনীতিতে যোগদান করেন? 

এখানে একটি প্রশ্ন খুব যুক্তিসঙ্গত ভাবেই উঠে আসে, শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির মতো একজন শিক্ষা জগতের সঙ্গে যুক্ত পদাধিকারী ব্যক্তি হঠাৎ করে কেনই বা বাংলার রাজনৈতিক রঙ্গমঞ্চে অবতীর্ণ হলেন? আরো স্পষ্ট করে বললে, শ্যামাপ্রসাদের রাজনীতিতে আসার মূল কারন কি ছিলো? 

এখানে বলে রাখা ভালো শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় কোন বিশেষ একটি কারনে তৎকালীন বাংলার রাজনীতিতে যোগদান করেন নি। তার রাজনীতিতে আসার বহুবিধ কারন ছিলো। আসল সমকালীন রাজনৈতিক পরিমন্ডলই তাকে রাজনীতির ময়দানে অবতীর্ণ হতে বাধ্য করেছিলো। 

(১.) ব্রিটিশ সরকার এবং মুসলিম লিগের যৌথ মদতে বাংলায় যেভাবে হিন্দুদের রাজনৈতিক অধিকার হননের চেষ্টা চলে তার বিরুদ্ধে যথাযোগ্য প্রতিরোধ গড়ে তোলার জন্যই শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় রাজনীতিতে আসতে চেয়েছিলেন। তার আসল উদ্দেশ্য ছিলো, রাজনীতিতে হিন্দুদের স্বার্থ সুরক্ষিত করা। 

(২.) ১৯৩২ খ্রিঃ রেমসে মেকডোনাল্ড তাঁর "সাম্প্রদায়িক বাঁটোয়ারা" নীতিতে যে ব্যবস্থার কথা বলেন তা ১৯৩৫ খ্রিঃ ভারত শাসন আইনে লাগু করা হয়। সাম্প্রদায়িক বাঁটোয়ারা মেনে ১৯৩৫ এর ভারত শাসন আইনে একদিকে যেমন হিন্দুমুসলিমদের আলাদা নির্বাচকমণ্ডলীর ব্যবস্থা করা হয়, তেমনই বাংলার আইনসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু জনসংখ্যার অনুপাতে আসনসংখ্যা অনেক কমিয়ে দেওয়া হয়। 

তৎকালীন সময়ে অবিভক্ত বাংলায় মুসলিমদের জনসংখ্যা ছিলো ৫৪%, অন্যদিকে হিন্দুদের সংখ্যা ছিলো ৪৬%। হিন্দুদের সংখ্যা প্রায় ৪৬% হওয়া সত্ত্বেও হিন্দুদের জন্য বরাদ্দ করা হয় মাত্র ৩২% আসন। সর্বমোট ২৫০ টি আসনের মধ্যে হিন্দুদের দেওয়া হয় মাত্র ৮০ টি আসন। শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি এটিকে হিন্দুদের রাজনৈতিক মেরুদন্ড ভেঙ্গে দেওয়ার একটি গোপন চক্রান্ত বলে মনে করেন। 

(৩.) অবিভক্ত বাংলায় মুসলিমরা সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়া সত্ত্বেও, ১৯৩৭ খ্রিঃ নবগঠিত "ফজলুল - লিগ সরকার" মাধ্যমিক শিক্ষা বিলের মাধ্যমে শিক্ষার নিয়ন্ত্রণ ও সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে মুসলমানদের জন্য বড় অঙ্কের কোটা নির্ধারন করেন। এর ফলে হিন্দুদের অধিকার বহুলাংশে ক্ষুন্ন হয়। বাংলার মতো একটি প্রদেশে, যেখানে মুসলমানরা সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিলো, সেখানে তাদের সংরক্ষণ দেওয়ার অর্থই ছিলো বাংলার সংখ্যা লঘু হিন্দুদের প্রতি অন্যায় অবিচার করে তাদের স্বার্থে আঘাত দেওয়া। শ্যামাপ্রসাদ এটা কখনই মেনে নিতে পারেন নি। 

(৪.) আমরা আগেই বলেছি, ১৯৩৭ খ্রিঃ নির্বাচনে কংগ্রেস বাংলায় বৃহত্তম দল হিসাবে উঠে আসে। কিন্তু কংগ্রেস বাংলায় সরকার গঠনে অংশ না নিয়ে প্রকারান্তরে মুসলিম লিগ কে সুবিধা করে দেয় এবং খোলা মাঠে খেলার সুযোগ করে দেয়। এই সুযোগে মুসলিম লিগ ফজলুল হকের জনপ্রিয়তাকে ব্যবহার করে গ্রামবাংলায় তাদের জনভিত্তি পাকাপোক্ত করে নেয়। এমতাবস্থায়, কংগ্রেসের মুসলিম তোষন নীতি ও হিন্দু স্বার্থ রক্ষার ব্যর্থতার প্রতিবাদেই শ্যামাপ্রসাদ পৃথক ও বিকল্প রাজনীতিতে যোগদানের সিদ্ধান্ত নেন। 

(৪.) হিন্দু মহাসভায় যোগদান :- 

এইরুপ পরিস্থিতিতে ১৯৩৯ খ্রিঃ হিন্দু মহাসভার সভাপতি বীর সাভারকর কলকাতা এসে যে জাতীয়তাবাদী বক্তব্য রাখেন, শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় তার দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত হন এবং হিন্দু মহাসভায় যোগদানের সিদ্ধান্ত নেন। ১৯৩৯ খ্রিঃ তিনি হিন্দু মহাসভায় যোগদানের অল্প দিনের মধ্যেই হিন্দু মহাসভার প্রধান নেতায় পরিনত হন। ১৯৪০ খ্রিঃ তিনি হিন্দু মহাসভার কার্যকরী সভাপতি এবং ১৯৪৩ খ্রিঃ দলের সভাপতি নির্বাচিত হন। 

(৫.) শ্যামা - হক মন্ত্রীসভা :- 

শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় হিন্দু মহাসভায় যোগদানের একবছরের মাথায় বাংলার রাজনৈতিক ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটে। 

১৯৪১ খ্রিঃ শেষের দিকে ফজলুল হকের সাথে মুসলিম লিগের চরম বিবাদ দেখা যায়। এর ফলে ফজলুল হক মুসলিম লিগ ত্যাগ করে শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির হিন্দু মহাসভা ও সুভাষ চন্দ্র বসুর ভাই শরৎচন্দ্র বসুর ফরওয়ার্ড ব্লকের সাথে হাত মিলিয়ে গঠন করেন নতুন সরকার । প্রগতিশীল রাজনৈতিক জোটের সমীকরনে ১৯৪১ খ্রিঃ গঠিত হয় "শ্যামা - হক মন্ত্রীসভা বা দ্বিতীয় ফজলুল হক সরকার। এর ফলে প্রথম পর্বের "লিগ- হক মন্ত্রীসভার" পতন ঘটে। শ্যামাপ্রসাদ নতুন সরকারের অর্থমন্ত্রী নিযুক্ত হন। 

শ্যামাপ্রসাদ নতুন মন্ত্রীসভায় যোগ দিয়ে একদিকে যেমন লিগের বিচ্ছিন্নতাবাদী রাজনীতিকে ঠেকানোর চেষ্টা করেন অন্যদিকে তেমনি হিন্দু - মুসলিমদের মধ্যে একটি ভারসাম্য বজায় রাখার নীতি গ্রহণ করেন। 

(৬.) সরকারের প্রতি ক্ষোভ ও মন্ত্রীত্ব ত্যাগ :- 

১৯৪২ সালে গান্ধীজির ডাকে ভারত ছাড়ো আন্দোলন শুরু হলে বাংলার পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক হয়ে উঠে। এই সময় মেদিনীপুরের পরিস্থিতি শ্যামাপ্রসাদকে অত্যন্ত বিচলিত করে তোলে। মেদিনীপুর সহ বাংলার আন্দোলনকারীদের ওপর সরকার নিষ্ঠুর দমননীতি নেয়। ৪২ এর শেষের দিকে মেদিনীপুরে ভয়ঙ্কর প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেখা যায় । এই সময় মেদিনীপুরের ঘুর্নিঝড়ে দুর্গত হিন্দুদের প্রতি সরকার উদাসীনতার নীতি নিলে, ক্ষুব্ধ শ্যামাপ্রসাদ এর প্রতিবাদে ১৯৪২ খ্রিঃ নভেম্বর মাসে অর্থমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করেন এবং দুর্গতদের সেবায় নিয়োজিত করেন। 

(৭.) ফজলুল হক সরকারের পতন :-

এদিকে ঠিক একই সময়ে ব্রিটিশ সরকারের সঙ্গে ফজলুল হকের সম্পর্ক নানা করনে অত্যন্ত তিক্ত হয়ে ওঠে। ১৯৪২ - ৪৩ খ্রিঃ বাংলার গর্ভনর ছিলেন স্যার জন হার্বাট। তিনি ফজলুল হককে খুব একটা পছন্দ করতেন না। তাকে এইসময় রাজনৈতিক ভাবে কোনঠাসা করে দেওয়ার জন্য হার্বাট মুসলিম লিগকে খেলার ময়দানে নামিয়ে দেন। 

সুকৌশলী লিগ এই সময় ফজলুল হকের মন্ত্রীসভাকে "হিন্দুপন্থী" বা হিন্দু তোষনকারী বলে প্রচারের ঝড় তোলে। শেষমেষ হার্বাট ১৯৪৩ খ্রিঃ ২৮ শে মার্চ ফজলুল হককে জোর করে পদত্যাগ পত্রে সই করতে বাধ্য করেন। ফজলুল হক মন্ত্রীসভার পতনটি একপ্রকার অন্যায় ভাবেই করানো হয়েছিলো। আইনসভায় ফজলুলকে উপযুক্ত সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রমানের কোন সুযোগ ব্রিটিশ সরকার দেয় নি। 

(৮.) মুসলিম লিগের নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার গঠন :- 

ফজলুল হক মন্ত্রীসভার পতনের পর বাংলার গভর্নর জন হার্বাট মুসলিম লিগকে সরকার গঠনের জন্য আমন্ত্রন জানান। এর ফলে ১৯৪৩ খ্রিঃ ২৪ শে এপ্রিল খাজা নাজিমুদ্দিনের নেতৃত্বে বাংলায় মুসলিম লিগ সরকার ও মন্ত্রীসভা গঠিত হয়। হোসেন সোহরাওয়ার্দী নতুন সরকারের খাদ্যমন্ত্রী হিসাবে নিযুক্ত হন। দ্বিতীয় বারে সরকারে আসার ফলে লিগ একদিকে যেমন নিজের জনভিত্তিকে শক্তিশালী করে তোলার সুবর্ন সুযোগ পেয়ে যায় তেমনি নতুন নির্বাচনে জেতার সব রাস্তাকে প্রশস্ত করারও যথেষ্ট পরিকল্পনা করে নিতে পারে। 

(৯.) ১৯৪৬ - মুসলিম লিগ/সোহরাওয়ার্দী সরকার গঠন :-

১৯৪৫ খ্রিঃ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হবার পর ব্রিটিশ সরকার ভারতে প্রাদেশিক সরকার গঠনের জন্য নির্বাচনের আয়োজন করে। এইসময় মুসলিম লিগ পৃথক পাকিস্তানের দাবিতে ব্যাপক প্রচার চালায় এবং বাংলা প্রাদেশিক নির্বাচনে বৃহত্তম দল হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে। তৎকালীন বাংলার গভর্নর ফ্রেডেরিখ বারোজ বৃহত্তম দলের প্রতিনিধি হিসাবে হোসেন সোহরাওয়ার্দীকে সরকার গঠনের জন্য আমন্ত্রণ জানায়। 

সোহরাওয়ার্দী প্রথমে কংগ্রেসের সঙ্গে সমঝোতা করে জোট সরকার গঠনের উদ্যোগ নিলে, কংগ্রেস নীতিগত ভাবে মুসলিম লিগের সঙ্গে সরকার গঠনে অসম্মত হয়। এমতাবস্থায় সোহরাওয়ার্দী নির্দল মুসলিম, তপশিলী হিন্দু ও ইউরোপীয় সদস্যদের সমর্থনে বাংলায় মুসলিম লিগের সরকার গঠন করেন। 

(১০.) মুসলিম লিগের হিন্দু নিধন যজ্ঞ :- 

১৯৪৬ খ্রিঃ ভারতে ক্ষমতা হস্তান্তরের জন্য ক্যাবিনেট মিশন আসে। ক্যাবিনেট মিশন তার প্রস্তাবে পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠনের কথা সুস্পষ্টভাবে বলে নি। নানা কারনে তা ব্যর্থ হয়ে যায় এবং ব্রিটিশ সরকার বিষয়টি নিয়ে টালবাহানা করতে থাকে। এমতাবস্থায় কংগ্রেস, ব্রিটিশ সরকার ও ভারতীয় হিন্দুদের ওপর চাপ সৃষ্টি করার উদ্দেশ্যে মহম্মদ আলি জিন্নাহ ১৯৪৬ খ্রিঃ ১৬ ই আগস্ট "ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে" বা "প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবস" - ঘোষনা করেন।

লিগের গোপন পরিকল্পনায় বলা হলো, ঐ দিন এমন পরিস্থিতি তৈরি করতে হবে, যাতে ব্রিটিশ সরকার, কংগ্রেস এবং হিন্দুরা পাকিস্তান মেনে নিতে বাধ্য হবে। তারা পাকিস্তান দিতে না চাইলে তা ছিনিয়ে নেওয়া হবে। কিভাবে ছিনিয়ে নেওয়া হবে, এবং মুসলমানরা কি করবে তার একটি নীল পরিকল্পনা প্রস্তুত করে রাখা হলো। জিন্না খেপা কুকুরের মতো বিভিন্ন জনসভায় "মু মে বিড়ি, গাল মে পান /লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান" - বলে মুসলমানদের খেপাতে লাগলেন। ধর্মান্ধ মৌলবীদের খোলা জনতার মাঝে লেলিয়ে দেওয়া হলো, যাতে তারা আগুনে ঘি ঢালার কাজটা আরোও ভালো ভাবে করতে পারে। 

"ডাইরেক্ট অ্যাকশনের" প্রভাবে বাংলায় দুটো বড়ো ঘটনা ঘটলো। এর প্রথমটা ছিলো" দ্যা গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং" বা কলকাতা হত্যাকাণ্ড। দ্বিতীয়টি ছিলো - নোয়াখালী দাঙ্গা। 

১৯৪৬ খ্রিঃ ১৬ ই আগস্ট হোসেন সোহরাওয়ার্দী ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে কে ভালো ভাবে রুপ দেওয়ার জন্য ঐ দিন সরকারি ছুটি ঘোষনা করে দেন। ছুটির অজুহাতে সরকারি পুলিশ প্রশাসনকে নিস্ক্রিয় রেখে চললো লিগের নারকীয় হিন্দু নিধন যজ্ঞ। একতরফা ভাবে ঐ দিন হিন্দুদের ওপর আক্রমন চালিয়ে ৫০০০ হিন্দুকে মেরে ফেলা হলো। হিন্দুদের বাড়ি ঘর, দোকানে হামলা চালিয়ে সবকিছু তছনছ করে দেওয়া হলো। বহু নারীকে ধর্ষিত করা হলো। শিশুরাও এই পৈশাচিক আক্রমন থেকে বাদ গেলো না। 

আগস্ট মাসের কলকাতার রেশ কাটতে না কাটতেই, দ্যা গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং এর প্রভাবে ১৯৪৬ খ্রিঃ অক্টোবর, নভেম্বর মাসে পূর্ববঙ্গের নোয়াখালী ও ত্রিপুরাতে (বর্তমান কুমিল্লাতে) চললো মুসলিমদের একতরফা হিন্দু নিধন যজ্ঞ এবং বলপূর্বক হিন্দুদের ধর্মান্তরিত করা। বাংলা আশ্বিন মাসে কোজাগরী লক্ষী পুজার দিন থেকে চলতে থাকে এই বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ড। 

এই দুই হত্যাকাণ্ড বাংলার হিন্দু সমাজের শিরদাঁড়ার ওপর  ঠান্ডা স্রোত বইয়ে দেয়। হিন্দুসমাজ চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে। ভয়ঙ্কর নোয়াখালী দাঙ্গায় শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে মহাত্মা গান্ধী যখন নোয়াখালী যাত্রা করেন, তখন দাঙ্গাবাজ মুসলমানরা গান্ধীর পরিভ্রমনের পথে কাঁটাগাছের ঝাঁড় ফেলে দিয়ে গান্ধীকেও রক্তাক্ত করে। ধর্ষিত হিন্দু নারীরা ক্রন্দন রত অবস্থায় গান্ধীর কাছে প্রতিকার চাইতে গেলে গান্ধী ঐ সমস্ত নারীদের মুসলমান ও ঈশ্বরের কাছে নিজেদের সঁপে দেওয়ার অহিংস প্রতিরোধের উপদেশ দেন। মাংস ও রক্তের স্বাদ পাওয়া সিংহের মুখে হিন্দুদের ছুঁড়ে ফেলার কংগ্রেসের গান্ধীয় বিধানটি আর যাই হোক শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় কিছুতেই মানতে পারলেন না। 

(১১.) শ্যামাপ্রসাদ ও হিন্দু মহাসভার রাজনৈতিক অবস্থান বদল :- 

কলকাতা ও নোয়াখালী হত্যাকাণ্ড শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও হিন্দু মহাসভার ভাবনা চিন্তাকে নাড়িয়ে দেয়। প্রথমদিকে হিন্দু মহাসভা ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় দেশভাগের বিরোধী হলেও, কলকাতা ও নোয়াখালী দাঙ্গা এবং জিন্না ও লিগের সাম্প্রতিক কার্যকলাপে বুঝতে পারেন, ভারত অখন্ড রাখা হয়তো সম্ভব নয়। তার থেকেও বড়ো কথা, পুরো বাংলা যদি পাকিস্তানের অন্তর্ভূক্ত হয়, তাহলে হিন্দুদের অবস্থা হবে অত্যন্ত শোচনীয়। তারা বাংলায় যে সংখ্যা লঘু হয়ে পড়বে এমন নয়, সাম্প্রদায়িক মুসলমানদের অত্যাচারে তাদের অস্তিত্বই বিপন্ন হয়ে যাবে। 

এমনিতেই ১৯৪০ খ্রিঃ লিগের লাহোর অধিবেশনে যখন পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠনের প্রস্তাব নেওয়া হয়, তখনই ঠিক করে নেওয়া হয়েছিলো ঐ পাকিস্তানের ভিতরে পুরো বাংলাকেই ঢুকিয়ে নেওয়া হবে। বাংলার যেসব অঞ্চল গুলো আছে তার মধ্যে কলকাতার প্রতি জিন্নার লোভ ছিলো একটু বেশিই। কলকাতা বাদ দিয়ে বাদবাকি বাংলা নিয়ে জিন্নার প্রয়োজনের আবেগও ততটা তীব্র ছিলো না। সেই সময় মাত্র ৫৪% মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলাকে পাকিস্তানের অন্তর্ভূক্ত করার দাবি ৪৬% হিন্দুদের কাছে শুধু অযৌক্তিক ছিলো না, ছিলো একটা অশনি সংকেত। মুসলমান সংখ্যাগুরু হলে সেখানে হিন্দুদের কি ভয়ঙ্কর পরিনতি হতে পারে - এটি সেই ঐতিহাসিক সার সত্যকে তুলে ধরে। 

যাইহোক, কলকাতা ও নোয়াখালী দাঙ্গার পর শ্যামাপ্রসাদের নেতৃত্বে হিন্দু মহাসভা তার রাজনৈতিক কৌশল পরিবর্তন করে। এই সময় শ্যামাপ্রসাদ বলেন - যদি ভারত ভাগ হয় তবে বাংলাকেও ভাগ করতে হবে। বাংলার মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ পাকিস্তানে যাক তবে বাংলার হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলকে ভারতের মধ্যেই রাখতে হবে। 

(১২.) হিন্দু স্বার্থ রক্ষার্থে পদক্ষেপ বনাম স্বাধীন বাংলা রাষ্ট্র গঠনের উদ্যোগ :- 

ভারত ভাগ যখন আসন্ন তখন  ১৯৪৭ খ্রিঃ শুরুর দিকে হোসেন সোহরাওয়ার্দী বাংলার কংগ্রেস নেতা শরৎচন্দ্র বসুকে সাথে নিয়ে স্বাধীন অখন্ড বাংলা রাষ্ট্র গঠনের একটা মডেল প্রস্তুত করেন, যেখানে বলা হলো, ভারত ভাগ হলেও, বাংলা অখন্ড থাকবে এবং তা ভারত বা পাকিস্তান কোন রাষ্ট্রেই যোগ না দিয়ে স্বাধীন অবস্থান নিয়ে ভবিষৎ নীতি নির্ধারণ করবে। 

বলা বাহুল্য, শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় এবং হিন্দু মহাসভা তীব্র ভাবে "সোহরাওয়ার্দী - শরৎ মডেলের" প্রতিবাদ করেন। তিনি বাংলার হিন্দুদের বোঝান, এটি পুরো বাংলাকে পাকিস্তানে অন্তর্ভূক্ত করার লিগের একটি ছদ্মবেশি ফাঁদ। পুরো বাংলাকে পাকিস্তানভুক্ত করার লিগের  "Soft policy" ।

(১৩.) নেহেরু ও প্যাটেলের সাথে যোগাযোগ :- 

সোহরাওয়ার্দী - শরৎ এর "অখন্ড বাংলা মডেলকে" বানচাল করার জন্য অতঃপর শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি কংগ্রেসের হাইকম্যান্ডের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তিনি জওহরলাল নেহেরু ও সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলকে বোঝাতে সক্ষম হন - (১.) স্বাধীন বাংলা হলে আদতে তা একটি মুসলিম রাষ্ট্র হবে। (২.) হিন্দুরা সেখানে অত্যাচারিত হবে এবং (৩.) ভারতের কলকাতা বন্দর হাতছাড়া হবে। (৪.) পরবর্তীকালে পাকিস্তান পুরো বাংলাকেই পাকিস্তানে অন্তর্ভূক্ত করবে। 

এইসময় শরৎচন্দ্র বসু গান্ধী লবিকে অখন্ড বাংলার পক্ষে প্রভাবিত করার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন। শ্যামাপ্রসাদের যুক্তি, বাংলার তীব্র জনমত ও জনরোশের কথা চিন্তা করে কংগ্রেস হাইকম্যান্ড অখন্ড বাংলা মডেলকে বাতিল করে দেন। 

(১৪.) হিন্দু বাঙালির হোমল্যান্ডের জন্য জনমত গঠন ও আন্দোলন :- 

অখন্ড বাংলা প্রস্তাবটি বানচাল করে দেওয়ার পর শ্যামাপ্রসাদের কাছে দ্বিতীয় চ্যালেঞ্জটি ছিলো, বাঙালি হিন্দুদের একটি পৃথক হোমল্যান্ড গঠনের জন্য জনমত ও আন্দোলন সংগঠিত করা। তিনি বাংলার বিভিন্ন স্থানে জনসমাবেশ করে এক্ষেত্রে বিষয়টির গুরুত্ব তুলে ধরেন এবং বাংলার সব হিন্দু নেতা ও বিধায়কদের এক ছাতার তলায় নিয়ে আসেন। 

(১৫.) হিন্দু মহাসভার তারকেশ্বর সম্মেলন :- 

১৯৪৭ খ্রিঃ এপ্রিল মাসে আধুনিক ভারতের ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার ঘটনা ঘটে তারকেশ্বর সম্মেলনে১৯৪৭ খ্রিঃ ৩ রা জুন বঙ্গভঙ্গের যে আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, তার মূল রাজনৈতিক ভিত্তি ও জনমত তৈরি হয় এই সম্মেলনেই। 

১৯৪৭ খ্রিঃ ৪ঠা এপ্রিল থেকে ৭ ই এপ্রিল বর্তমান হুগলি জেলার তারকেশ্বর হাইস্কুল ময়দানে বঙ্গীয় হিন্দু মহাসভার ৩ দিনের সম্মেলন বসে। এই সম্মেলনের নেতৃত্ব দেন শ্যামাপ্রসাদ। এই সম্মেলনে এক বক্তৃতায় তিনি অত্যন্ত যুক্তিসঙ্গত ভাবে বাংলা ভাগের পক্ষে তার মত তুলে ধরেন। তিনি বলেন - 

"বাংলার সাম্প্রতিক সমস্যার সমাধান করার এবং বাংলার হিন্দু - মুসলমান - দুই সম্প্রদায় যাতে শান্তিতে ও স্বাধীনভাবে বসবাস করতে পারে, তার একমাত্র সহজ সমাধান হলো বাংলা প্রদেশকে ভাগ করা এবং হিন্দুদের জন্য একটি পৃথক হোমল্যান্ড তৈরি করা, যা হবে পশ্চিমবঙ্গ।" 

শ্যামাপ্রসাদের যুক্তিপূর্ণ বক্তব্যকে তৎকালীন অমৃতবাজার পত্রিকা সহ বাংলার সব প্রথম শ্রেণীর পত্রিকা গুলিই সমর্থন করে। এইসময় আজকের জনপ্রিয় পত্রিকা আনন্দবাজার পত্রিকা অত্যন্ত ক্ষুরধার কলমে লেখে পাঞ্জাবে শিখ ও বাংলায় হিন্দুদের বাঁচানোর একমাত্র উপায় হলো এই দুটি প্রদেশকে বিভক্ত করা। 

কংগ্রেস হাইকম্যান্ডও প্রস্তাবটি মেনে নেয় এবং তারকেশ্বর সম্মেলনের প্রস্তাবের ওপর ভিত্তি করেই পরবর্তীকালে বাংলা বিধানসভার হিন্দু বিধায়করা বাংলা ভাগের পক্ষে ভোট দেন, যার ফলেই পশ্চিমবঙ্গের জন্ম হয়। 

তারকেশ্বর সম্মেলনের সিদ্ধান্তের ওপর ভিত্তি করেই ব্রিটিশ সরকার ১৯৪৭ খ্রিঃ ৩রা জুন মাউন্টব্যাটন পরিকল্পনা ঘোষনা করে, যেখানে পাঞ্জাব ও বাংলার আইনসভার সদস্যদের ভোটাভুটির মাধ্যমে প্রদেশ ও ভারত বিভাজনের কথা বলা হয়। 

(১৬.) বাংলা ভাগ ও পশ্চিমবঙ্গের পক্ষে আইন সভায় ভোটাভুটি:- 

অবশেষে উপস্থিত হয় বহু প্রতিক্ষিত সেই দিন ও ক্ষন। ঠিক হয় বাংলা ভাগ হবে কিনা তা বাংলা আইনসভাতেই ঠিক করে নেওয়া হবে। বাংলা ভাগের উদ্দেশ্যে ১৯৪৭ খ্রিঃ ২০ জুন, বাংলা বিধানসভার বিশেষ অধিবেশন ডাকা হয়। ঐ দিন ভোটাভুটির উদ্দেশ্যে বিধানসভার সদস্যদের দুটি ভাগে ভাগ করা হয়, যথা - (১.) বাংলার মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলের প্রতিনিধি বা বিধায়ক এবং (২.) হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলের প্রতিনিধি বা বিধায়ক। ঠিক হলো এই দুই শিবিরের মতামত ও ভোট নিয়েই বাংলার ভাগ্য নির্ধারণ করা হবে। 

বিধান সভার প্রথমার্ধে হিন্দু ও মুসলিম বিধায়কদের নিয়ে যৌথ অধিবেশন বসে। যৌথ অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন নুরুল আমিন। যৌথ অধিবেশনে প্রস্তাব আনা হয় - "বাংলা ভাগ হবে না এবং বাংলা অবিভক্ত ভারতে যোগদান করবে"। শ্যামাপ্রসাদ সহ পশ্চিমবঙ্গের পক্ষে থাকা সকল বিধায়ক এই প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দেন। কিন্তু প্রস্তাবটি মুসলিম বিধায়কদের আপত্তির কারনে ১২৬ - ৯০ ভোটে খারিজ হয়ে যায়। 

যৌথ অধিবেশনের পর বাংলা প্রশ্নে আরো সুস্পষ্ট মত ও নির্দেশের জন্য হিন্দু ও মুসলমান বিধায়কদের নিয়ে আলাদা অধিবেশন বসে এবং সেখানে প্রস্তাবের পক্ষে বিপক্ষে মত নেওয়া হয়। 

প্রথমে মুসলমান ব্লকের অধিবেশন বসে। এখানে সভাপতিত্ব করেন নুরুল আমিন। যৌথ অধিবেশনে অখন্ড বাংলার ভারতে যোগদানের প্রস্তাব বাতিল হয়ে যাওয়ার পর মুসলমান লবিতে দুটি প্রস্তাব আনা হয় - (১.) "বাংলা ভাগ হবে"। মুসলিম লিগ যেহেতু পুরো বাংলাকেই পাকিস্তানে অন্তর্ভুক্ত করার সমর্থক ছিলো তাই এই প্রস্তাবটি ১০৬ - ৩৫ ভোটে খারিজ হয়ে যায়। এরপর দ্বিতীয় প্রস্তাবটি আনা হয় - (২.) "বাংলা ভারত বা পাকিস্তানে যোগদান করবে" । এই প্রস্তাবটি পাকিস্তানে যোগদানের পক্ষে ১০৭ - ৩৪ ভোটে পাস হয়। 

এরপর হিন্দু ব্লকের অধিবেশনে মত নেওয়া হয়। এখানে সভাপতিত্ব করেন বর্ধমানের মহারাজা উদয়চাঁদ মহতাব। যৌথ অধিবেশনে অখন্ড বাংলার ভারতে যোগদানের প্রস্তাব খারিজ হয়ে যাওয়ার পর হিন্দু ব্লকে দুটি প্রস্তাব আনা হয় - (১.) বাংলা ভাগ হবে এবং (২.) বাংলা ভাগ হবার পর বাংলার হিন্দু প্রধান অঞ্চল ভারতে যোগদান করবে। হিন্দু ব্লকে দুটি প্রস্তাবই ৫৮ - ২১ ভোটে পাস হয়। 

হিন্দু বিধায়কদের সিদ্ধান্তের ওপর ভিত্তি করে ঠিক হয়, বাংলা ভাগ করা হবে এবং বাংলার হিন্দু প্রধান অঞ্চলকে ভারতের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হবে। 

(১৭.) ভারতের "অঙ্গরাজ্য" রুপে পশ্চিমবঙ্গের জন্ম :- 

বাংলা বিধানসভার ভোটাভুটির ফলাফলকে সিদ্ধান্ত ধরে স্যার সিরিল রেডক্লিফকে বাংলা বিভাজনের দায়িত্ব দেওয়া হয়। রেডক্লিফ দুই বাংলার সীমানা নির্ধারণ করে বাংলাকে দুটি ভাগে ভাগ করেন। তার সিদ্ধান্তের ওপর ভর করে মুসলিম প্রধান পূর্ববঙ্গকে পাকিস্তানের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয়, যা পরবর্তীকালে "পূর্ব পাকিস্তান" নামে পরিচিত হয়। অন্যদিকে পশ্চিমাঞ্চলে থাকা হিন্দু প্রধান বাংলাকে "পশ্চিমবঙ্গ" নাম দিয়ে ভারতের একটি অঙ্গরাজ্যে পরিনত করা হয়। 

এইভাবে ১৯৪৭ খ্রিঃ ২০ জুন বাংলা বিধানসভার সিদ্ধান্তের ওপর ভর করে পশ্চিমবঙ্গ জন্ম নেয় বলে ঐতিহাসিকগত ভাবেই ২০ জুন তারিখটিকে "পশ্চিমবঙ্গ দিবস" নামে ঘোষনা করা হয়। পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য গঠনের পরবর্তীকালে বাংলার বহু হিন্দু বাঙালি অধ্যুষিত অঞ্চলকে পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয়। 

(ক.) ১৯৫০ খ্রিঃ ১ জানুয়ারি, কোচবিহারকে একটি করদ রাজ্য থেকে পশ্চিমবঙ্গে সংযুক্ত করা হয়, যা পরবর্তীতে পশ্চিমবঙ্গের একটি পৃথক জেলা হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে। 

(খ.) ১৯৫৪ খ্রিঃ ২রা অক্টোবর, ফরাসিদের উপনিবেশ থেকে মুক্ত করে চন্দননগরকে হুগলি জেলার সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয়। 

(গ.) ১৯৫৬ খ্রিঃ ১ নভেম্বর, ভাষা আন্দোলনের ফলে বিহার থেকে আলাদা করে বাংলাভাষী মানভূম জেলার একাংশকে  পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয় এবং এই অংশটির নতুন নাম দেওয়া হয় - "পুরুলিয়া" যা একটি পৃথক জেলা হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে। 

(ঘ.) ১৯৫৬ খ্রিঃ রাজ্য পুনর্গঠন আইনের ফলে বিহারের পূর্নিয়া জেলার কিষানগঞ্জ মহকুমার কিছু অঞ্চল পশ্চিমবঙ্গের দিনাজপুর জেলার সঙ্গে যুক্ত করা হয়, যা উত্তর ও দক্ষিণ বঙ্গের মধ্যে সংযোগ তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। 

এইভাবে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের প্রচেষ্টায় ও আন্দোলনের ফলে স্বাধীন ভারতে আজকের "পশ্চিমবঙ্গ" রাজ্যের জন্ম ও মানচিত্র প্রস্তুত হয়। 

(খ.) শ্যামাপ্রসাদের প্রচেষ্টায় যদি পশ্চিমবঙ্গ তৈরি না হতো তাহলে বাঙালি হিন্দুদের কি পরিনতি হতো? 

পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য গঠনের ঐতিহাসিক পর্যালোচনার শেষে একটি প্রশ্ন অবধারিত ভাবে উঠে আসে, শ্যামাপ্রসাদের প্রচেষ্টায় যদি আজকের পশ্চিমবঙ্গ না গঠিত হতো এবং বাংলা অবিভক্ত থাকতো, তাহলে সেখানে বাঙালি হিন্দুদের কি পরিনতি হতো? 

এর সহজ উত্তর একটাই, আজ সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানের দেশ বাংলাদেশে হিন্দুদের যে পরিনতি হচ্ছে, পশ্চিমবঙ্গের হিন্দুদেরও সেই পরিনতি হতো। মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ হলে সেখানে হিন্দুরা কিভাবে এবং কতখানি বঞ্চিত হয় তার  বহু পুরানো ও পরীক্ষিত ইতিহাস আমাদের কাছেই আছে।

 অভিভক্ত পরাধীন ভারতে ৫৪% সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়েও, মুসলমানরা শুধু পৃথক দেশ গঠন করতে উদ্যত হয় নি, হিন্দুদের রাজনৈতিক ভাবে কোনঠাসা করারও চেষ্টা চালিয়েছিলো। তাদের ওপর নানাবিধ সামাজিক ও ধর্মীয় নিপীড়ন চালিয়েছিলো। 

আমরা পূর্বেই আলোচনা করেছি, ১৯৩৫ খ্রিঃ ভারত শাসন আইনে সাম্প্রদায়িক বাঁটোয়ারা নীতি মেনে বাংলার ৪৬% হিন্দুর জন্য আসন বরাদ্দ করা হয়েছিলো মাত্র ৩২%। এর প্রতিবাদে ১৯৩৬ খ্রিঃ ১৪ ই জুলাই টাউন হলে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সভাপতিত্বে হিন্দুরা প্রতিবাদ জানায়। এই প্রতিবাদ সভায় অংশ নেন শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, প্রফুল্ল চন্দ্র রায়, রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়, নীলরতন সরকারের মতো দিকপালরা।

শুধু তাই নয়, ১৯৪০ খ্রিঃ পাকিস্তান প্রস্তাবে অত্যন্ত অযৌক্তিক ভাবে পুরো বাংলাকেই পাকিস্তানে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি পেশ করা হয়। বলপূর্বক বাংলাকে দখলে নেওয়ার জন্য দাঙ্গার ছক কষা হয়। ১৯৪৭ খ্রিঃ দেশভাগের সময় বর্তমান বাংলাদেশের সর্বমোট হিন্দু জনসংখ্যা ছিলো ২৮%। এই জনসংখ্যার রেশ পরবর্তী দশ বছরের গড়ে এরকম দাড়ায় -

  • ১৯৫১ - ২২%
  • ১৯৬১ - ১৮.৫%
  • ১৯৭৪ - ১৩.৫%
  • ১৯৮১ - ১২.১%
  • ১৯৯১ - ১০.৫%
  • ২০০১- ৯.৬%
  • ২০১১ - ৮.৫%
  • ২০২২ - ৭.৯৫%
বাংলাদেশে হিন্দু জনসংখ্যার এই বিপুল পরিমাণ হ্রাসের একটি বড়ো কারন হলো, মুসলিমদের নানাবিধ চাপে হয় দেশত্যাগ করা নয়তো বলপূর্বক ধর্মান্তরিত হয়ে যাওয়া। একথা বলার অবকাশ থাকে না, সেদিন যদি শ্যামাপ্রসাদের উদ্যোগে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য গঠিত না হতো, তাহলে অবিভক্ত ভারতে পশ্চিমবঙ্গের বাঙালি হিন্দুদেরও একই পরিনতি হতো। 
পশ্চিমবঙ্গ গঠিত হয়েছে বলেই বাংলাদেশের হিন্দুদের একটা বড়ো অংশ স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে মুসলমানদের বহুবিধ ধর্মীয় ও সামাজিক নির্যাতনের শিকার হয়ে পশ্চিমবঙ্গে আশ্রয় নিতে পেরেছিলেন এবং এখনো পাচ্ছেন। পশ্চিমবঙ্গ না থাকলে তাদের কপালে সে সুযোগটুকুও জুটতো না। মৃত্যু নয়তো ধর্মান্তরিত হয়ে যাওয়া - এই দুটোর মধ্যে কোন একটাকে তাদের বেছে নিতে হতো। 

মধ্যযুগে পশ্চিমবঙ্গের বাঙালিদের ইসলামের দুর্নিবার ধর্মান্তরের আগ্রাসন থেকে বাঁচিয়ে দিয়েছিলেন শ্রীচৈতন্যদেব। আর আধুনিক কালে ইসলামের রাষ্ট্রীয় আগ্রাসন থেকে হিন্দুদের বাঁচিয়ে দেন শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়। এই দুজনই বাঙালি হিন্দুর শুধু ধর্মীয় নেতা ছিলেন না, ছিলেন কালপুরুষ, যুগপুরুষ, মহাপুরুষ এবং অবশ্যই বাঙালির আইকন।  

সমস্ত ষড়যন্ত্র, অপচেষ্টার কবল থেকে শ্যামাপ্রসাদ শুধু বাঙালি হিন্দুদের রক্ষাই করেন নি, তাদের সুরক্ষার জন্য "পশ্চিমবঙ্গ" নামক পৃথক হোমল্যান্ড তৈরিও করে দেন। তিনি প্রকৃত অর্থেই ছিলেন আজকের আসল "পশ্চিমবঙ্গের জনক ও কারিগর"। শিল্প সৃষ্টির অন্তিম লগ্নে সদর্পে তাই তিনিই বলতে পেরেছিলেন - "কংগ্রেস ভারত ভাগ করেছে, আর আমি পাকিস্তানকে ভাগ করে দিয়েছি।" 


Post a Comment (0)
Previous Post Next Post